7 December 2022

NEWSCOPE

"Open to all, but Influenced by None"

“পশ্চিমবঙ্গের রূপকার”, ডঃ বিধান চন্দ্র রায়

“পশ্চিমবঙ্গের রূপকার”, ডঃ বিধান চন্দ্র রায়

তানিশ মুখার্জি- ১ জুলাই ১৮৮২ থেকে ১ জুলাই ১৯৬২। মাঝে ৮০টা বছর। শুধু বিধানই দিয়ে গেলেন। কখনও চিকিৎসক হিসাবে রোগীদের, কখনও উপাচার্য হিসাবে ছাত্রদের, কখনও মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে রাজ্যবাসীকে। এককথায় ‘বিধান’ নামটি সার্থক। কেশবচন্দ্র সেনের ‘নববিধান’ নামে বইয়ে অনুপ্রাণিত হয়েই পিতা প্রকাশচন্দ্র রায় ‘বিধান’ নামকরণ।
মহাত্মা গান্ধী বলতেন,  “বিধান, দ্য সেফ্টি হ্যান্ড অব ইন্ডিয়া।” আজ ডঃ বিধান চন্দ্র রায়ের জন্ম ও মৃত্যু দিবস।

ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। চিকিৎসক রূপে তিনি ছিলেন ধন্বন্তরি। এই কিংবদন্তী চিকিৎসক শিক্ষাবিদ, স্বাধীনতা সংগ্রামী ও রাজনীতিবিদ্‌-ও ছিলেন। বাংলার রাজনীতির এক টালমাটাল সময়ে তিনি টানা ১৪বছর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীত্ব করেছিলেন। প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষের পর তিনি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী। পশ্চিমবঙ্গকে নবরূপে গড়ে তুলেছিলেন তিনি।

তিঁনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১ই জুলাই, ১৮৮২ সালে, বিহার রাজ্যের অন্তর্গত পাটনার ঝাঁকিপুরে গ্রামে।
১৯০১ সালে পাটনা কলেজ ম্যাথ (অনার্স) বিএসসি পাশ করে তিঁনি কলকাতায় চলে আসেন। ১৯০৬ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে এল এম এস এবং দু’বছর পর ১৯০৮ সালে এম ডি ডিগ্রী লাভ করেন তিঁনি।

ডঃ বিধানচন্দ্র রায়-এর জীবিকা ছিল চিকিৎসক। ১৯১১ সালে ইংল্যান্ড থেকে এফ.আর.সি.এস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতার ক্যাম্বেল মেডিকেল স্কুলে (বর্তমানে নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ) শিক্ষকতা ও চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট সদস্য, রয়াল সোসাইটি অফ টপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিন ও আমেরিকান সোসাইটি অফ চেস্ট ফিজিশিয়ানের ফেলো নির্বাচিত হন। ১৯১৯ সালে তিঁনি কারমাইকেল মেডিক্যাল কলেজে মেডিসিনের অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় ১৯৪২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন।

দেশবন্ধুর উৎসাহে ১৯২০তে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন বিধান চন্দ্র। কিছুদিনের মধ্যে আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে কংগ্রেসে যোগদান করেন। ১৯৩১-এ গান্ধীজির ডাকে আইন অমান্য আন্দোলনে যোগদান করে কারাবরণ করেন। দেশ স্বাধীন হবার পর উত্তরপ্রদেশের গভর্নর হওয়ার জন্য তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু প্রস্তাব দিলে অসুস্থতার কারণে তা হয়নি। জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্ব বিধান রায়কে দেওয়ার কথা লর্ড মাউন্টব্যাটেন জওহরলাল নেহেরুকে বলেছিলেন। এরপর কংগ্রেস দলের প্রতিনিধিত্বে ১৯৪৮ সালের ১৪ই জানুয়ারি থেকে মৃত্যুকাল অবধি ১৪ বছর তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।

স্বাধীনোত্তর ভারতে বাংলার টালমাটাল পরিস্থিতি ছিল। ১৯৪৮-এ উদ্বাস্তু সমস্যা রাজ্যে ভয়াবহ আকার নিয়েছিল, সেইসময় বিধান রায় তাদের দিয়েছিল অন্ন ও বাসস্থানের প্রতিশ্রুতি। বহু পতিত জমি উদ্ধার করে বাসস্থানের জন্য গড়ে তুললেন সল্টলেক, লেক টাউন, কল্যাণী উপনগরী প্রভৃতি। বেকারদের জন্য কর্মনিয়োগের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। বাংলায় শিল্পের জন্য প্রতিষ্ঠা হল দুর্গাপুর ইস্পাতনগরী, চিত্তরঞ্জন রেলইঞ্জিন কারখানা। দার্জিলিং-এ দেশের মধ্যে প্রথম পর্বতারোহণ শিক্ষাকেন্দ্র তৈরি হল। কলকাতার পর হলদিয়া বন্দর গড়ে ওঠা, এমনকি ফারাক্কা ব্যারেজ গড়ে ওঠার পেছনেও বিধান চন্দ্রের ভূমিকা ছিল।

তাঁর চোদ্দো বছরের মুখ্যমন্ত্রিত্বে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রচুর উন্নতি সাধন হয়েছিল। এই কারণে তাঁকে “পশ্চিমবঙ্গের রূপকার” নামে অভিহিত করা হয়।
তিঁনি প্রতিষ্ঠা করেন পাঁচটি নতুন শহর যথা- দুর্গাপুর, বিধাননগর, কল্যাণী, অশোকনগর- কল্যাণগড় ও হাবরা। তিঁনি পশ্চিমবঙ্গের রূপকার নামেও অভিহিত।

১৯৬২ সালে তিঁনি ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্ন পুরষ্কার লাভ করেন। ডঃ বিধানচন্দ্র রায়ের স্মৃতি রক্ষায় কলকাতার উপনগরী সল্টলেকের নামকরণ করা হয় বিধান নগর।
১৯৮২ সালে ডঃ বিধানচন্দ্র রায়ের প্রতীক ভারতীয় পোস্টাল স্ট্যাম্পে ব্যবহৃত হতো।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মারা যাওয়ার পর, কলকাতায় তাঁর স্ত্রী বাসন্তী দেবীর মুখোমুখি বিধান রায় দাঁড়ালে, মিসেস দাশ কাতর আর্তিতে বলেছিলেন, “বিধান তুমি থাকতে উনি বিনা চিকিৎসাই এভাবে চলে গেলেন।” নিশ্চুপ ছিলেন বিধান। ডঃ শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যুর পরও তাঁর মা এমনই কথা বিধানচন্দ্র রায়কে বলেছিলেন।

১ই জুলাই, ১৯৬২ সালে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন ডঃ বিধানচন্দ্র রায়। তাঁর জন্ম ও মৃত্যু দিবস ১ই জুলাইকে সারা ভারতে “চিকিৎসক দিবস” রূপে আমরা পালন করা হয়ে থাকে।

>
%d bloggers like this: